দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণসমূহের মধ্যে প্রধানতম কারণ ছিল ১৯৩৩ সালে আডলফ হিটলার ও তার নাৎসি পার্টির জার্মানির রাজনৈতিক অধিগ্রহণ এবং তাঁদের উগ্র বৈদেশিক নীতি; এবং গৌণ পরিসরে কারণ ছিল ইতালীয় ফ্যাসিবাদ এবং জাপান সাম্রাজ্যবাদ।
তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা কিন্তু হয়েছিল ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর শুধুমাত্র জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণ ও 32 থেকে 112 কিমি প্রশস্ত পলিশ করিডোর দখলের মধ্য দিয়ে। সেদিন জার্মানির অপ্রতিরোধ্য বাহিনীর সামনে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিলো পোল্যান্ড এবং জার্মানি দখল করে নিয়েছিল পলিশ করিডোর। সেই ঘটনা থেকেই সারা বিশ্বজুরে ছড়িয়ে পড়েছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা।
আবার সাম্প্রতিক এমন নিদর্শন দেখা গেছে রাশিয়ার ইউক্রেন invasion এর ঘটনায়। একটি ক্ষুদ্র দেশ ইউক্রেন আক্রমণকে কেন্দ্র কে বর্তমানে সারা বিশ্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
এমনকি মহাভারতেও কৌরব পক্ষের যুবরাজ দুর্যোধন পান্ডবদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সুচাগ্র মেদিনী। সুতরাং বুঝতেই পারছেন বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সামান্যতম জমিও কতটা sensitive বিষয়।
কিন্তু এখন আমি যদি আপনাদের বলি এমন এক সম্রাটহীন সাম্রাজ্যের কথা যাকে পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র নিজেদের বলে দাবি করেনা। বরং তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাউকে সেই ভুখন্ড দেওয়া হলে তৎক্ষণাৎ তারা তা অস্বীকার করে এবং অপর রাষ্ট্রগুলোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে তৎপর হয়। এমনকি মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশের কিছু কিছু পর্যটক সেখানে যায় এবং নিজেকে সেখানকার সম্রাট বলে ঘোষণা করে, সেই ভুখন্ড টাকে নিজের সাম্রাজ্যে পরিণত করতে তৎপর হয়। কি অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন এ আবার কেমন কথা?
আসুন তবে বিস্তারিত বলি,
বৃহৎ আফ্রিকা মহাদেশের দুটো দেশ মিশর ও সুদানের মাঝে একটি ভুখন্ড হলো Bir Tawil। এর উত্তরে জবাল টাউইল পর্বত, দক্ষিনে অবস্থিত Wadi Tawil। পুরো অঞ্চলটা 2060 বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা 0। Academic language এ জায়গাটিকে বলা হয় Terra Nullius। latin শব্দ terra এর অর্থ পৃথিবী। Terra Nullius ল্যাটিন শব্দটির ইংলিশ অর্থ হলো Nobody's Land....... এই ভুখন্ডটিকে না মিশর দাবি করে, না সুদান দাবি করে। এমনকি বিশ্বের কোনো দেশ এতে আধিপত্য বিস্তার করতে উৎসুক নয়। কিন্তু জায়গাটি এমন কেন?
আসুন, বিষয়টাকে গভীর থেকে বোঝার চেষ্টা করা হোক। আগে আমাদের ইতিহাসটা জানতে হবে।
18 শ শতকে মিশর ছিল অটোমান সাম্রাজ্যর অধীনে। ১৬শ ও ১৭শ শতাব্দীতে বিশেষত সুলতান প্রথম সুলাইমানের সময় অটোমান তথা উসমানীয় সাম্রাজ্য দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ, কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিম এশিয়া, ককেসাস, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলসহ বিস্তৃত একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল। কিন্তু এই অটোমান তথা উসমানীয় সাম্রাজ্য মিশরে একটি autonomy প্রদান করেছিল। অর্থাৎ এক প্রকারের স্বশাসনের অধিকার প্রদান করেছিল, ফলে মিশর নিজের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে International affair গুলো নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করত। ফলে অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ হয়েও তৎকালীন মিশর তাদের প্রতিবেশী সুদান ও দক্ষিণ সুদান দুটো দেশকেই নিজ ক্ষমতাবলে দখল করে নিয়েছিল। ফলত মিশর, সুদান এবং দক্ষিণ সুদান সমগ্র অঞ্চলটি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ছিল। কিন্তু এর ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাদের চিন্তার মূল কারণ ছিল যে ততদিনে সুয়েজ ক্যানেল টি ধীরে ধীরে তৈরী হয়ে এসেছিল। এবং সুয়েজ ক্যানেল টি ছিল ব্রিটিশদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং অন্যান্য বাণিজ্য কর্ম স্বল্প সময়ে চালানোর জন্য সহজসাধ্য পথ হয়ে উঠেছিল সুয়েজ ক্যানেলটি। কিন্তু সেই সমগ্র অঞ্চলটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনস্থ থাকলে ব্রিটিশদের প্রভূত সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। ফলত ব্রিটিশরা উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছ থেকে এই সমগ্র অঞ্চলটি দখল করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলশ্রুতিতে ওই সমগ্র অঞ্চলের ওপর আধিপত্য স্থাপনের জন্য একটি রক্তক্ষয়ী ভয়াবহ যুদ্ধ হয়, যা ইতিহাস এর পাতায় Anglo Egypt war (1882) নামে পরিচিত।
এই যুদ্ধের ফলে মিশর দখলের পাশাপাশি মিশরের অন্তর্ভুক্ত সুদান এবং দক্ষিণ সুদানও ব্রিটিশদের দখলে চলে আসে।
কিন্তু তারপর ব্রিটিশরা লক্ষ্য করে যে এতে তাদের সমস্যা গিয়েছে বেড়ে। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা জানত না যে সুদান ও দক্ষিণ সুদানে ইতিমধ্যে স্বাধীনতার জন্য বিপ্লব,বিদ্রোহ চলছে। মিশরের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য এবং সুদান দখলের কারণে সুদান বাসীরা ইতিমধ্যে ক্ষিপ্ত ছিল।
ফলে যে ঝাল এতদিন মিশর সরকারকে পোহাতে হতো, সেটা এখন ব্রিটিশ সরকারকে পোহাতে হবে। যাকে বলে খাল কেটে কুমির আনা। ফলে বেগতিক দেখে ব্রিটিশরা একটা স্থায়ী সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চিন্তা করে। তারা মিশর এবং সুদান দেশ দুটির মাঝে একটি আন্তর্জাতিক সীমানা অংকন করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইতিহাস পড়ে থাকলে আপনারা জানবেনই যে ব্রিটিশরা এ সকল ক্ষেত্রে কতটা উদাসীনভাবে কাজ করে। যেন তাদের কাছে উপনিবেশ দেশগুলোর সমস্যার কোনো মূল্যই নেই। এই ঘটনার ব্যতিক্রম ঘটেনি মিশর এবং সুদানের ক্ষেত্রেও। 1899 সালে উদাসীনভাবে সীমানা অঙ্কন করার জন্য Hala ib Triangle নামে একটি অঞ্চল চলে আসে মিশরের অধীনে। কিন্তু সেই অঞ্চলটিতে প্রচুর সুদানবাসীরা বসবাস করত এবং ঐতিহাসিকভাবে মিশরের অংশ Bir Tawil চলে যায় সুদানের অংশে। ফলে উভয় দেশেই জনতার মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে আবার রক্তক্ষয়ী সমস্যা শুরু হয়। আপনারা ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে উদাসীনভাবে এবং অজ্ঞতার সাথে ৱ্যাডক্লিফ লাইন অংকনের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল।
লাগাতার এই সমস্যাগুলি চলার ফলে তিন বছর পর 1902 সালে ব্রিটিশরা পুনরায় একটি সীমানা অংকন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই নতুন সীমানা অংকন এর ফলে নতুন মানচিত্রে Hala ib Triangle চলে আসে সুদানের অধীনে এবং Bir Tawil চলে যায় মিশরের অধীনে। কিন্তু এই বিষয়টি মিশরের সর্বত্র সমান ভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
এরপর 1952 সালে স্বাধীনতা পায় মিশর এবং 1956 সালে স্বাধীনতা পায় সুদান। কিন্তু আদিকাল থেকে সীমানা নিয়ে চলে আসা এই সংঘাত ততদিনেও থামেনি।
দুটো দেশেই Hala ib Triangle অঞ্চলটি পাবার জন্য কূটনৈতিক লড়াই চলতে থাকে। কারণ এই অঞ্চলটি ছিল তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানির উৎস এবং বন্দর সমৃদ্ধ। কিন্তু পরিবর্তে Bir Tawil অঞ্চলটি ছিল অনুর্বর, জনবিরল এবং বসবাস প্রতিকূল। ফলে এই Hala ib Triangle অঞ্চলটি পাবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন এগ্রিমেন্ট ফলো করে। মিশর মান্যতা দেয় 1899 সালের এগ্রিমেন্ট এবং সুদান মান্যতা দেয় 1902 সালের এগ্রিমেন্ট। এই নিয়ে কূটনৈতিক লড়াই চলতেই থাকে।
এক দেশ অপর দেশকে Bir Tawil এর অধিকর্তা বলে ঘোষণা করলেই সেই দেশটি গর্জে ওঠে। কারণ মিশরের ক্ষেত্রে Bir Tawil অঞ্চলটি গ্রহণ করার অর্থ হলো 1902 সালের এগ্রিমেন্ট কে মান্যতা দেওয়া। যার ফলে উর্বর অঞ্চলটি চলে যেতে পারে সুদানের হাতে।
ফলতো উভয়দেশের কোনটিই Bir Tawil অঞ্চলটিকে গ্রহণ করে না। এমনকি বিশ্বের কোন দেশই ওই অঞ্চলটিতে আধিপত্য স্থাপন করতে ইচ্ছুক নয়।
এর ফলে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন দেশের কিছু পর্যটক এই অঞ্চলটি তে গিয়ে নিজেদের পতাকা গেড়ে এই অঞ্চলটিকে নিজের সাম্রাজ্য বলে ঘোষণা করে এবং মাঝেমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে ওঠে।
2018 সালে একজন ভারতীয়, ইন্দোরের একজন তরুণ আইটি উদ্যোক্তা সুয়াশ দীক্ষিত মিশর সীমান্তবর্তী এই বিতর্কিত জমিটি দাবি করেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন যে এটি তার রাজ্য। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে খবরটি ভাইরাল হয়েছিল। মিশরের সেনাদের ইমেইল করার পর কোন প্রত্যুত্তর না পেয়ে তারা নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে অতি সন্তর্পনে টেরোরিস্টদের ভয় কে উপেক্ষা করে সেই অঞ্চলটিকে পৌঁছে সূর্যমুখীর একটি বীজ বপন করে নিজেকে সেখানকার রাজা ঘোষণা করেছিলেন। রাষ্ট্রপশু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টিকটিকিকে, নিজের বাবাকে ঘোষণা করেছিলেন সেখানকার রাষ্ট্রপতি। কিন্তু যেকোন একটা অঞ্চলকে নিজের রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে গেলে অন্যান্য রাষ্ট্রের মান্যতা পাওয়া জরুরি। তার জন্য অবশ্য তিনি ইউনাইটেড নেশনস এর কাছে আপিল করেছিলেন। কিন্তু ইউনাইটেড নেশনস কখনোই কোন individual person কে সেই অধিকার দেয়নি।







❤❤❤❤
ReplyDeleteThank You 💖💖
Deleteবেশ তথ্যসমৃদ্ধ লেখা! নতুন অনেককিছু জানতে পারলাম l
ReplyDeleteThank You 💖💖
Delete😍😍😍😍
ReplyDeleteThank You 💖💖
Deleteবাহ্, অনেক কিছু জানলাম। খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteThank You 💖💖
Deleteখুব ভালো হয়েছে এটা 👍
ReplyDeleteThank You 💖💖
DeleteBesh boro soro article..tobe besh valo
ReplyDeleteThank You 💖💖
DeleteOre shabash bro
ReplyDeleteDarun hoyeche !!
ReplyDelete👍👍👍
ReplyDelete