দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অগ্রসর অর্থনীতির দেশ শ্রীলঙ্কা, যেখানে মাথাপিছু জিডিপি 3,852 ডলার এবং পপুলেশন 21.8 মিলিয়ন । শ্রীলঙ্কার ৯৫ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গণমুখী। শ্রীলঙ্কান তামিল টাইগারদের ওপর সরকারি বাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পর বিশ্বের কাছে একুশ শতকের সফল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ধারণ করছিল দেশটি।
কিন্তু বর্তমানে দেশটি আর্থিক দেউলিয়া ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সারা দেশ ব্যাপী আর্থিক সংকট ও খাদ্যসংকট। তারউপর বিপুল ঋণের বোঝা এবং শুন্য পরিমান জ্বালানি! দেশটিতে এখন ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করেছে! দেশের ভেতরে মুদ্রাস্ফীতি, মারাত্মক রকমের খাদ্যসংকট জনগনকে বাধ্য করেছে এরম চরমপন্থায় অবতীর্ণ হতে।
কিন্তু শ্রীলংকার এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? অথবা কিভাবে একটা উন্নয়নকারী দেশের এহেন পরিস্থিতি হলো?
আসুন বরং বিস্তারিত আলোচনা করি.......
শ্রীলংকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো পর্যটন এবং এগ্রিকালচার!! 1948 সালে স্বাধীনতা পায় শ্রীলংকা। কিন্তু দেশটিতে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আধিপত্য বজায় ছিল। ১৯৭২ সালে শ্রীলঙ্কা একটি প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা গ্রহণ করে। ১৯৭৮ সালে একটি সংবিধান প্রবর্তন করা হয়েছিল যা নির্বাহী রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান করে তোলে। স্বাধীনতাউত্তরকাল থেকেই শ্রীলংকা সারা বিশ্বের কাছে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে সমাদর পায়। ভারতমহাসাগর শ্রীলংকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছিল দারুন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতাউত্তরকালে বৈদেশিক বাণিজ্য শুরু করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। কিন্তু অপরদিকে 1983 সাল থেকে চলা শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং প্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে শ্রীলংকা যেন হয়ে গেছিলো অস্পৃশ্য। শ্রীলংকার অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বহিরবিশ্বের কোনো দেশ শ্রীলংকায় ইনভেস্ট করতে রাজি ছিলোনা । উপরন্তু তৎকালীন চঞ্চল পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল সিকিউরিটির পেছনে রাষ্ট্রের ব্যয় 4% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল প্রায় 20% যা অর্থনীতিকে অনেকটা বেসামাল করে দেয়।
তবে এই গৃহযুদ্ধের সময়টা কাটিয়ে ওঠার পর শ্রীলংকা পুনরায় নিজ রাষ্ট্রের উন্নয়নের পরিকল্পনা শুরু করে। তারা Hambantota port নামক একটি ড্রিম প্রজেক্ট নিয়ে বিশ্বের দরবারে হাজির হয়, তারা মনে করে এই প্রকল্পটি সাফল্য অর্জন করলে শ্রীলংকা অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা সবলতা অর্জন করবে। কিন্তু পাশ্চাত্বের দেশগুলি এমনকি ভারতের কাছেও শ্রীলংকা প্রত্যাখ্যাত হয়।
ভারত প্রত্যাখ্যান করলেও শ্রীলংকাকে সতর্ক করে এবং উপদেশ দেয় যে এই Hambantota port project এ আদতে সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই নগন্য এবং এই প্রজেক্টটি ফেল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। কিন্তু শ্রীলংকা সেদিন সে উপদেশ কানে তোলেনি। তারা এই প্রজেক্টটিকে বাস্তবায়িত করতে দৃঢ়সংকল্প ছিল। ফলে তারা গিয়ে উপস্থিত হয় China এর দোরগোড়ায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সতর্ক করেছিল যে হাম্বানটোটা বন্দর পূর্ব-পশ্চিম আন্তর্জাতিক শিপিং রুট বরাবর অবস্থিত ভারত মহাসাগরে চীনকে একটি সামরিক আধিপত্য দিতে পারে। যদিও কলম্বো ও বেইজিং উভয়ই জানিয়েছিল যে , শ্রীলংকার বন্দরগুলো কোনো সামরিক স্বার্থে ব্যবহার করা হবে না। ফলে শ্রীলংকা সে সকল সতর্কবাণী উপেক্ষা করে চীনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন? চীন নিজেও জানতো যে এই Hambantota port project টি পুরোদস্তুর ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু তবুও তারা শ্রীলংকায় ইনভেস্ট করে। এগুলি হলো চীনের স্ট্রাটেজি। এবং যথারীতি যখন প্রজেক্টটি ব্যর্থ হয়ে যায় এবং চীনের দেওয়া সমস্ত ঋণ মেটাতে শ্রীলংকার নাকানিচোবানী অবস্থা ঠিক তখন শ্রীলংকা এই সম্পূর্ণ বন্দরটি চীনের কাছে 99 বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়। এবং চীনও অতি কম মূল্যে এই বন্দর লাভ করে তাঁদের বাণিজ্যকে শক্তিশালী করে নেয়। এভাবেই ধুরন্ধর চীন দীর্ঘদিন ধরে developing country গুলোকে exploit করে আসছে।
এটি শ্রীলংকার অর্থনৈতিক অবনমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাছাড়া চতুর্দিকে একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে, শ্রীলংকার এ অর্থনৈতিক সংকট শাসকদের একনায়কত্বের ফসল! আসুন বিষয়টা একটু বিশ্লেষণ করা যাক। মাহিন্দা রাজাপক্ষ 2005 সাল থেকে 2015 সাল অব্দি শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার অধীনেই শ্রীলংকা দীর্ঘদিন ধরে চীনের কাছ থেকে প্রচুর পরিমানে ঋণ নিয়েছে। Hambantota port, Lotus tower of Colombo প্রভৃতি কারণে। বর্তমানে গোটাবায়া রাজাপক্ষ শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট। তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বসেই নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মাহিন্দা রাজাপক্ষ কে প্রধানমন্ত্রীর পদে উপবিষ্ট করেন এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পুত্র তথা ভাইপো নামাল রাজাপক্ষকে youth and sports minister পদে উপবিষ্ট করেন। যে কিনা নিজেই এক সময় জেলের কয়েদি ছিল। কয়েদি শব্দটা হয়তো উপযুক্ত নয়, তবে money launderingএর কেসে তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। গোটাবায়া রাজাপক্ষ তার অপর ভ্রাতা বাসিল রাজাপক্ষকে Finance Minister পদে উপবিষ্ট করেন। আপনারা জানলে বিস্মিত হবেন নিজের এই ভ্রাতাকে মন্ত্রিত্ব প্রদান করতে শ্রীলংকা সরকার নিজেদের সংবিধানেই পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন। তাহলে একবার লক্ষ করুন একটা রাষ্ট্রের প্রশাসন কিভাবে একটি পরিবারকে ঘিরে কেন্দ্রিত হচ্ছে। ডেমোক্রেসি তথা গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে সারা রাস্ট্র জুড়ে চলতো পরিবারতান্ত্রিক রাজতন্ত্র।
তবে সমস্যাটা সেখানে নয়, সমস্যার উৎপত্তি হয় তখন যখন সমগ্র প্রশাসনজুড়ে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। যখন সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্নীতির আখড়া হয়ে ওঠে। এই ফাইনান্স মিনিস্টার বাসিল রাজাপক্ষ প্রতিটি ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট থেকে 10% দাবি করতেন নিজের জন্য। অর্থাৎ প্রতিটি গভর্নমেন্ট প্রোজেক্টের বেশ কিছুটা অংশ গিয়ে ঢুকতো রাজাপক্ষ পরিবারে। যদিও এটি দুর্নীতির একটি নমুনা মাত্র, আদতে সমগ্র প্রশাসনজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল দুর্নীতির প্রবাহ। শ্রীলংকা সরকার 2020 সালে তাঁদের সংবিধানের 20 তম সংশোধন পাস করে, যা শ্রীলংকার জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।
2019 সালে গোটাবায়া রাজাপক্ষ শ্রীলঙ্কাকে 100% অর্গানিক ফার্মিং রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রতিজ্ঞা করে। কিন্তু 2021 সালের এপ্রিল মাসে হঠাৎ করে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার আমদানি করা নিষিদ্ধ করে দেয়। বিস্মিত হচ্ছেন তো? শুধু আপনি নন, সকলেই হয়েছিল। গোটাবায়া দেশের কৃষিবিদ ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শ না নিয়েই সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্তে দেশের কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। অনেকে তো বলেন এগুলো শুধুমাত্র ভুয়ো এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ছিল। আদতে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার ইমপোর্ট করার মত সামর্থ্য সে মুহূর্তে শ্রীলংকার ছিলই না।
মাঝখান থেকে এই চক্করে 69 মিলিয়ন টাকা খরচ হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাক্ষের অধীনে শ্রীলংকার বর্তমান সরকার তার দেশে বড় ধরনের কর কমিয়েছে। কর কমানোর ফলে সরকারের মারাত্মক রকমের আয় কমেছে এবং যার ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি খরচ তো সে অনুপাতে গিয়েছে বেড়ে। সেই অতিরিক্ত খরচ মেটানোর জন্য শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত টাকা ছাপতে শুরু করে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অর্থ ছাপানো বন্ধ করার জন্য শ্রীলংকার সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল। যথেচ্ছা টাকা ছাপানোর কুপ্রভাব কী হতে পারে তা আজ প্রায় সারা বিশ্ব জানে। আইএমএফ সতর্ক করে দিয়েছিল টাকা ছাপানো অব্যাহত থাকলে একটি অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ হতে পারে। একে বলা হয় hyper inflation......যদি যথেচ্ছভাবে টাকা ছাপতে আরম্ভ হয়ে যায় আর জিনিসের পরিমাণ একই থাকে তবে জিনিস প্রতি দাম প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়,এতেই ঘটে অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ। 2000 সালে এই ঘটনা ঘটেছিলো Zimbabwe তে। এই একই ঘটনা ঘটে শ্রীলংকার ক্ষেত্রে। পণ্যের আমদানি সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার সরকার দেশে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে।
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির হার দিন দিন বেড়ে চলেছে । শ্রীলংকান রুপির বৈদেশিক মান কিছুদিন আগেও ছিল ১ ডলারে ১৯০ রুপি, গত এক মাসে সেটা ২৩০ রুপিতে পৌঁছে গেছে।
জানুয়ারি 2020 থেকে এখন পর্যন্ত শ্রীলংকার foreign currency reserve 2.3 বিলিয়ন ডলার্স। যে দেশের ক্ষেত্রে এটার পরিমাণ যত কম সে দেশের পক্ষে বহির্জগৎ থেকে আমদানিতে ততই সংকট। তার ওপর শ্রীলংকা সরকার 4 মিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে রেখেছে। সবথেকে সমস্যাটা কোথায় জানেন, ভারতবর্ষের মত বৃহৎ দেশে বহু দ্রব্য দেশের ভেতরেই উৎপাদন হয়, ফলে সমস্ত কিছু বিদেশ থেকে আমদানি করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু শ্রীলংকার মত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের উৎপাদন খুবই নগণ্য। ফলে শ্রীলঙ্কাকে একটি বৃহৎ পরিমাণ দ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এবং এই সংকটকালীন সময়ে যা একরকম দুস্কর হয়ে উঠেছে।
দেশটির এ সংকটকালীন পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢেলেছে করোনা মহামারি, কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের হিড়িক, রাতারাতি কৃষি খাতে ‘অর্গানিক ফার্মিং’ চালুর জন্য প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষ।
এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে 26 জন পলিটিকাল লিডার পদত্যাগ করেছেন।
বর্তমানে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট তদারকের জন্য মিলিটারি জেনারেলের নেতৃত্বে কঠোর নজরদারি সংস্থা গড়ে তুলেও অবস্থা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের কী শিক্ষণীয়? যেকোনো দেশের পক্ষে দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবারতান্ত্রিক রাজতন্ত্র কতটা ক্ষতিকর সেটা বোঝা যায় এই পরিস্থিতি থেকে। এ সকল ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সচেতন হয়ে উঠতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এরকম কোন পরিস্থিতি ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে না ঘটে। দেশের ভেতরে গৃহযুদ্ধ কতটা ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে তারও নিদর্শন এই পরিস্থিতি। বড় প্রকল্পের জন্য ঋণ পরিশোধের দায় যেন দেশের কাঁধে বোঝা হয়ে না পড়ে।
বর্তমানে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নেই, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে সচেতন হতে হবে। শুধুমাত্র পুঁজিপতিদের দিকে দৃষ্টিপাত না করে সাধারন মানুষদের কথাও ভাবতে হবে।
উপরিউক্ত আজকের এই আর্টিকেলটি Intellectual Mind বিভাগের অন্তর্ভুক্ত....






Absolutely amazing
ReplyDeleteKhub bhalo hyeche
ReplyDelete💗👍
ReplyDeleteTotally awesome 🥰
ReplyDelete👍👍👍👍❤️❤️❤️❤️
ReplyDeleteDarun Vai 👍👍👍
ReplyDeleteদারুণ হয়েছে ভাই 💖
ReplyDelete